ইসলামের আদর্শ
পাঠঃ২
যখন যিশু জুডিয়ায় আবির্ভূত হলেন তখন একটি বংশ____জিহোভার উপাসকগণ আল্লাহর একত্ববাদ এবং ক্ষমতা ও করুণার মাধ্যমে বিশ্বপ্লাবী পরম ইচ্ছাশক্তির ধারণা গ্রহণ করেছিল।এমনকি এই বংশের লোকদের মধ্যেও সকল প্রয়াস সত্ত্বেও আল্লাহর ধারণা,হয় পৌত্তলিক জাতিস্মূহের সংস্পর্শে এসে পঙ্কিলতা প্রাপ্ত হয়েছিল,নয় বিধর্মী দর্শনসমূহের প্রভাবে রুপান্তারিত হয়েছিল।এক পক্ষে চ্যাল্ডীয়-নাজীয় দর্শন ইহুদি ঐতিহ্যের উপর তার অনপনেয় প্রভাব বিস্তার করেছিল,পক্ষান্তরে তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম চিন্তাবিদেরা গ্রিক ও রোমান দার্শনিকদের মধ্যে মহান আদি কারণের ধারণার সূচনা করলেও আলেকজান্দ্রীয় চিন্তাগোষ্ঠীর মধ্যে এমন সব ধারণা সংযুক্ত করেছিল যা তাঁদের একত্ত্ববাদী ধর্মমতের সঙ্গে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
যিশু যখন তাঁর ধর্মমত প্রচার করেছিল,তখন হিন্দুদের মধ্যে অনেক দেবদেবীর পূজা হতো;মাজো-যরথুস্ত্রবাদীগণ দুই ঐশী সত্তার ধারণা নিয়ে প্রভুত্ত্ব অর্জনের জন্য সংগ্রাম করেছিল;গ্রিক,রোমান ও মিশরীয়দের মন্দির বিভিন্ন উপাস্য-বিগ্রহে পরিপূর্ণ ছিল,আর তাঁদের নৈতিকতা উপাসকদের নৈতিকতারও নিম্নে অবস্থিত ছিল।এই ছিল সেকালের সভ্যজগতের অবস্থা।যিশু তাঁর যাবতীয় স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়েও তাঁর অত্যুৎসাহী অনুসারীদের আরোপিত সকল প্রবঞ্চনা থেকে সম্পুর্ণ মুক্ত ছিলেন।তিনি কখনও নিজেকে 'আল্লাহর পরিপূরক'কিংবা 'ঐশী' সত্তার অংশ'হিসেবে দাবি করতেন না।
এমনকি আধুনিক ভাববাদী খ্রিস্টধর্ম অতীত যুগসমূহের অবতারবাদের ঐতিহ্য এখনও পর্যন্ত ঝেড়ে ফেলতে পারেনি।যুগ যুগ ধরে মহান শিক্ষকের ইতিহাস থেকে যাবতীয় মানবিক উপাদান পরিহার করে তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে পৌরাণিক কাহিনীর জগাখিচুড়িতে পর্যবসিত করা হয়েছিল।'এক শতাব্দীর তা দেয়ার ফলে' নিউ টেস্টামেন্ট সম্মানিত ব্যক্তিত্বকে অস্পষ্টর্তার কুজ্ঝাটিকায় আবৃত করে ফেলেছিল।প্রতিদিন 'অনন্তের বুকে জাত কলা'শক্তি সংগ্রহ করেছিল এবং নিসের পরামর্শ সভায় তাঁর আকৃতি ও সামঞ্জস্য বিধান করা হয়েছিল ও একটি ধর্মমতে রুপান্তরিত করা হয়েছিল।
অনেক মানুষ সর্বজনীন পিতার দূরবর্তিতায় বিভ্রান্ত হয়ে মধ্যবর্তী পথে এক মানবিক ব্যক্তিত্ত্বের মধ্যে আশ্রয় খোজে এবং তাঁকে তাঁরা ঐশী বলে অভিহিত করে।উপাসনার নিকটবর্তী বস্তুর এই আবশ্যকতা আধুনিক খ্রিস্টধর্মকে একটি আদর্শের নামকরণ করে সেই আদর্শকে রক্তমাংসের ইন্দ্রিয়গাহ্য বস্তুতে রুপান্তরিত করেছে এবং তাঁকে মানব-ঈশ্বর বলে পূজা করেছে।
নাজারাতের প্রেরিতপুরুষ যে পৌনঃপুনিকতাসহকারে নিজেকে'আল্লাহর পুত্র 'বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁর ঐশিত্ত্বের প্রমাণস্বরুপ নিজে আল্লাহর ন্যায় একই উপসনা দাবি করেছিলেন তা 'ডিফেক্টস আব মডার্ন ক্রিশ্চিয়ানিটি'গ্রন্থের মেধাবী(?)লেখক তা বিচার করছেন।যেভাবে খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও যুক্তিবাদীরা ব্যাখ্যা করেছেন যে,যিশু নিজেকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন,তা আমরা সম্পূর্ণরুপে অস্বীকার করে থাকি।
ম্যাথু আর্নন্ড চূড়ান্তভাবে দেখিয়েছেন যে,নিউ টেস্টামেন্টের বিবরণ বহু দিক দিয়ে সম্পূর্ণরুপে অবিশ্বাস্য।যদি ধরে নেওয়া যায় যে, তাঁর প্রতি যে গুনাবলি আরোপ করা হয়েছে তিনি তা ব্যবহার করেছিলেন ,তাতে কি প্রমাণিত হয় যে,তিনি 'পিতার একমাত্র জাত'?খ্রিস্টান যুক্তিবাদীরা কি শোনেননি যে, প্রাচ্যের বিখ্যাত সাধক আল হাল্লাজ যিনি নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছিলেন,বলেছিলেন,'আনালহক্ক,___'আমি সত্য' এবং ইহুদি সেনহেড্রিমের মতো মুসলমান শাস্ত্রজ্ঞাগণ নিন্দনীয় বাক্যের জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলো ও প্রাণদন্ডে দন্ডিত করেছিল?বেচারা সরলহৃদয় সাধককে সুগভীর মরমি উপলব্দি ব্যক্ত করার জন্য এভাবে জগৎ থেকে বিদায় নিতে হলো।বাবি সম্প্রদায়ের লোকেরা এখনও বিশ্বাস করে যে, তাঁদের নেতা ____অনন্ত জীবনের 'ফটক'নিহত হননি ,তাঁকে অলৌকিক উপায়ে স্বর্গে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।একথা কি বলা যেতে পারে যে,যখন আবু মুঘিস আল হাল্লাজ এবং বাব নিজেদের 'সত্য' ও 'স্বর্গের ফটক'বলেছিলেন;তখন তাঁরা কি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তাঁরা ঐশী সত্তার অংশ,আর যদি তাঁরা তাই বোঝাতে চেয়েছিলেন তবে তাঁদের দাবি কি প্রমাণের সমকক্ষ?কিন্তু আমরা ,পূর্বেই বলেছি যে,যিশুর ধারণাসমূহকে তাঁর শিষ্যদের কুসংস্কার থেকে মুক্ত করলে তাঁর চরিত্র বাঁ ব্যক্তিত্ব এককভাবে অতিরঞ্জন দোষমুক্ত হয়।আমরা একথা অস্বীকার করি যে,তিনি এমন উক্তি করেছেন যা তাঁর প্রতি আরোপিত দাবি প্রতিপন্ন করতে পারে। আল্লাহর 'পিতৃত্ব' সম্পর্কীয় ধারণা সমগ্র মানবজাতিরকে স্পর্শ করেছিল।সব মানুষই আল্লাহর সন্তান এবং তিনি সেই চিরন্তন পিতা, কর্তৃক প্রেরিত তাঁদের শিক্ষক।সুতরাং খ্রিস্টান্দের সম্মুখে মহত্তর দৃষ্টান্তই ছিল।নাজারাতের প্রেরিতপুরুষের শিক্ষা তাদেরকে উপাস্যের এক বিশুদ্ধতর ধারণায় উন্নীত করা উচিৎ ছিল।কিন্তু ছয় শত বছর ধরে তাঁর ব্যাক্তিত্ত্বকে কেন্দ্র করে তাঁর বাণীর বিরোধী পুরাণ(বানোয়াট গল্পকথা)গড়ে উঠেছে,যা তাঁকে খোদাতে পর্যবসিত করেছে।জগতের উপাসনার ক্ষেত্রে 'দাস'প্রভুর স্থান দখল করেছে।অজ্ঞ জনসাধারণ নব্য পিথাগোরীয় মতবাদ,প্লেটোবাদ,জুডিয়ো-হেলেনীয় দর্শনের সঙ্গে যিশুর শিক্ষার এই অদ্ভুত সংমিশ্রণ উপলব্ধি করতে অসমর্থ হয়ে যিশুকে খোদার অবতার বলে পূজা করত কিংবা স্মৃতিচিহ্ন ও ধাতুতে খোদিত দেবীর মূর্তি,যা যিশুর নির্ভেজাল মাতার প্রতিবেদন ছিল,সেই আদিম উপাসনায় ফিরে গিয়েছিল।


0 মন্তব্যসমূহ
আপনার মন্তব্য পেশ করুন...